নিজস্ব প্রতিনিধি , নবগ্রাম :- মুর্শিদাবাদ জেলার লালবাগ মহকুমার অন্তর্গত একটি কৃষি ও প্রাণী সম্পদ অধুষ্যিত ব্লক। ১০-টি গ্রাম পঞ্চায়েতে বিভক্ত নবগ্রাম ব্লকের কৃষিজীবীদের মূল জীবিকা সবজি ও ধান চাষ (দুই ফসলি), পাট, সর্ষে এবং পশুপালন। নবগ্রাম ব্লকের নারায়ণপুর পঞ্চায়েতের অন্তর্গত মাঝিগ্রাম এর কৃষি বধূ তিথি মন্ডল (৩৫)। তিথির শৈশব কাটে বীরভূম জেলার রাধানগর গ্রামে। পিতা কৃষি শ্রমিক।
মূলতঃ দারিদ্রের কারণেই মেধাবী তিথির অষ্টম শ্রেণীর পর আর পড়াশোনা হয় নি। ১৮ বছর বয়সেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্বামীও পেশায় কৃষক। ছয় সদস্য বিশিষ্ট পরিবারটির জীবন -জীবিকা পারিবারিক কৃষি ও পশুপালনের উপরেই নির্ভরশীল। বর্তমানে তিথির পরিবারের মোট কৃষি জমি ৬-বিঘা। মূল ফসল ধান (আমন ও আউস), পেঁয়াজ, আলু ও সর্ষে। অন্যদিকে পশুখামারে রয়েছে বর্তমানে দুটি গরু ও দুটি ছাগল। কৃষি বধূ ছাড়াও তিথির আরো একটি পরিচিতি “মাঝিগ্রাম মা তারা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর” নেত্রী হিসেবে।
রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন নবগ্রাম ব্লকে কাজ শুরু করে ২০২০ সাল থেকেই মূলত স্বনির্ভর গোষ্ঠীর প্রশিক্ষণ এবং হেল্পলাইন পরিষেবার মাধ্যমে। ধীরে ধীরে এই কাজের পাশাপাশি আলোকপাত করা হয় প্রাণী সম্পদ বিকাশের উপর। ২০২১ সালের শেষ দিকে তিথি একটি গ্রামীণ সচেতনতা শিবির থেকে রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের হেল্পলাইন নম্বর ১৮০০ ৪১৯ ৮৮০০ সহ বিভিন্ন জীবিকা বিকাশ কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত হন। ধীরে ধীরে হেল্পলাইন নম্বর এর মাধ্যমে ফাউন্ডেশনের বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে তথ্য আদান প্রদান করতে থাকেন। স্বামী কৃষি ক্ষেতে ব্যস্ত থাকার জন্য পশু পালনের কাজটি তিথি নিজের হাতেই সামলান।
কিন্তু সম্পূর্ণ ঘরোয়া পদ্ধতি এবং প্রাণীর চিকিৎসার বিষয় সম্পর্কে ধ্যান ধারণা না থাকার ফলে প্রায়শঃই প্রাণী অসুস্থ হতো এবং মারাও যেত। এমতাবস্থায় ২০২৩ সালের ২৪ জুন রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন সারগাছি কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের সাথে যৌথ উদ্যোগে মাঝিগ্রামে পশু চিকিৎসা ও টিকাকরণ শিবিরের আয়োজন করে। মোট ২৮ জন প্রাণিপালক এই শিবিরে অংশগ্রহণ করে এবং ২৫১ টি প্রাণীর টিকাকরণ সম্পন্ন হয়। তিথিও এই শিবিরে অংশগ্রহণ করেন এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ২-টি গরু এবং ২-টি ছাগলের টিকাকরন করেন। পাশাপাশি গরুর দুধ বৃদ্ধির জন্য বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে ভিটামিন, কৃমির অসুধ সহ প্রাণীর জীবন চক্র অনুসারে কখন কি অসুধ দিতে হবে এবং কিভাবে প্রাণী খামার পরিচর্যা করতে হবে সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা লব্ধ করেন। এই শিবিরের আগে তিথির একটি গরু এবং চার টি ভেড়ার মৃত্যুও ঘটে। শিবিরের পর পশু বিশেষজ্ঞের সুপারিশমতো প্রাণীর পরিচর্যা করার ফলে বর্তমানে তিথির গরুর দুধের পরিমান দৈনিক গড়ে গাভী পিছু ৪-কেজি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৫.৫ কেজি। স্থানীয় দুগ্ধ সমবায় তে ৪৫/- টাকা কেজি দরে দুধ বিক্রি করছেন। গাভী পিছু পরিচর্যার খরচ দৈনিক গড়ে ৫০/- টাকা। মাসিক দুগ্ধ উৎপাদনের পরিমান প্রায় ১৬৫ কেজি। মোট বিক্রয়লব্ধ আয় মাসিক ৭৪২৫/- টাকা। এখান থেকে মাসিক খরচ গাভিপিছু ১৫০০/- টাকা বাদ দিলে নীট লাভ গাভী পিছু মাসিক আনুমানিক ৬০০০/- টাকা।
তিথির কথায় ” আমাদের প্রত্যন্ত গ্রাম বাংলায় প্রথাগত প্রাণী চিকিৎসক এর পরিষেবা পাওয়া খুবই দুস্কর। প্রাণী অসুস্থ হলে প্রায় ১০-কিমি দূরে ব্লক প্রাণী সম্পদ কার্যালয় নিয়ে যেতে হয়। এটা একদিকে যেমন ব্যয়সাধ্য, পাশাপাশি পরিবহনের কারণে নিয়ে যাওয়াও সমস্যা। রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের ধারাবাহিক পশু চিকিৎসা শিবিরের ফলে আজ আমরা সুস্থায়ী ভাবে প্রাণী পালন করতে পারছি” ।

