“শীতের কুয়াশায় আলোর রোশনাই, গ্রামবাংলার মাটিতে ফের যাত্রাপালার প্রাণের উৎসব।”
স্বর্ণালী হালদার, কলকাতা :- শীতের কনকনে ঠান্ডা, ভোরের ঘন কুয়াশা আর খেজুর রসের মিষ্টি ঘ্রাণ— এই তো গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ। কিন্তু এই শীতের আমেজ যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায় যদি না সেখানে আসর বসে ‘যাত্রাপালার’। আধুনিকতার ভিড়ে যখন সিনেমা বা ওটিটি-র দাপট, তখন আজও গ্রাম বাংলার মাটির টানে বেঁচে আছে প্রাচীন এই শিল্প। শীতের রাত্রে হ্যাজাক কিংবা রঙিন আলোর রোশনাইয়ে ফের প্রাণ ফিরে পাচ্ছে গ্রামবাংলার যাত্রা উৎসব।
শীতকাল এলেই বাংলার গ্রামগঞ্জে যেন নতুন প্রাণ ফিরে আসে। খোলা মাঠ, স্কুলের আঙিনা কিংবা মন্দির প্রাঙ্গণে বসে যাত্রাপালার আসর। রঙিন আলো, ঢাক–কাঁসার শব্দ আর মাইক থেকে ভেসে আসা সংলাপ—সব মিলিয়ে যাত্রাপালা শুধু নাটক নয়, গ্রামবাংলার আবেগ ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।
রাত বাড়ছে, বাড়ছে হিমেল হাওয়ার দাপট। কিন্তু তার মধ্যেই গ্রামের খোলা ময়দানে থিকথিকে ভিড়। কুয়াশার চাদর ভেদ করে দূর থেকে ভেসে আসছে বিবেক কিংবা অধিকারীর সেই উদাত্ত কণ্ঠস্বর।
গ্রামের আট থেকে আশি— সকলেই এখন মগ্ন যাত্রাপালার জাদুতে। এক সময় মনে করা হয়েছিল বিনোদনের নতুন জোয়ারে বুঝি হারিয়ে যাবে এই শিল্প, কিন্তু শীতের এই মরসুমেই প্রমাণ মিলছে যে যাত্রাপালার টান আজও বাংলার মানুষের মজ্জায়।
শীতের ফসল তোলার পর মানুষ কিছুটা অবসর পায়। সেই অবসর সময়েই যাত্রাপালার আয়োজন হয় বেশি। রামায়ণ, মহাভারত, মনসামঙ্গল, চৈতন্যলীলা কিংবা সামাজিক কাহিনি—সব ধরনের গল্পই উঠে আসে যাত্রার মঞ্চে। অভিনেতাদের গানের তালে তালে অভিনয়, সংলাপ আর নাচ দর্শকদের রাত জাগিয়ে রাখে।
যাত্রাপালা শুধু বিনোদন নয়, এটি লোকশিল্পীদের জীবিকার বড় ভরসা। বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। শীতের যাত্রা উৎসব তাই গ্রামবাংলার অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
আজ আধুনিক বিনোদনের যুগেও যাত্রাপালার অবদান কমেনি। বরং শীতের রাত, কুয়াশা ঢাকা মাঠ আর হাজারো দর্শকের ভিড়—সব মিলিয়ে যাত্রাপালা এখনও বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অমূল্য ঐতিহ্য।

