একজন মেধাবী ছাত্রের কেন এই করুণ পরিণতি হলো? তাঁর জীবনের সেই মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত।
অনন্যা ব্যানার্জী, কলকাতা: বিশাল ভরদ্বাজের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘হায়দার’-এর সেই দৃশ্যটির কথা মনে পড়ে? যেখানে ধ্বংসস্তূপের মাঝ থেকে এক কিশোরকে উদ্ধার করা হয়েছিল ।রূপালি পর্দার সেই ‘চকোলেট বয়’ বাস্তব জীবনেও এক অবিশ্বাস্য রূপান্তরের গল্প লিখেছিলেন—তবে তা সাফল্যের নয়, বরং এক চরম ট্র্যাজেডির।
যাঁর চোখে একসময় অভিনেতা বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন ছিল, সেই সাকিব বিলাল শেখের মেধাবী ছাত্র থেকে লস্কর জঙ্গি হয়ে ওঠা এবং শেষ পর্যন্ত এনকাউন্টারে প্রাণ হারানোর ঘটনাটি কেবল একটি জীবনের অবসান নয়, বরং আধুনিক কাশ্মীরের এক জলজ্যান্ত ও করুণ পরিহাস।
কীভাবে এক প্রতিভাবান কিশোরের রঙিন স্বপ্নগুলো বন্দুকের নলের সামনে ফিকে হয়ে গেল, সেই হাড়হিম করা ঘটনার সাক্ষী সাকিব বিলাল শেখ নামের সেই কিশোর। অভিনেতা থেকে লস্কর-ই-তৈয়বা জঙ্গি হয়ে ওঠা এবং শেষ পর্যন্ত এনকাউন্টারে মৃত্যুর কাহিনী।
সাকিব বিলাল শেখ যখন ‘হায়দার’ ছবিতে অভিনয় করেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। ছবিটিতে তিনি একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। অমর সিং কলেজের একটি দৃশ্য যেখানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে, সেখানে তিনি একমাত্র জীবিত কিশোর বা ‘চকোলেট বয়’ হিসেবে ১৫ সেকেন্ডের একটি দৃশ্যে উপস্থিত ছিলেন। সাকিব কেবল একজন অভিনেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন মেধাবী ছাত্র। তিনি দশম শ্রেণির পরীক্ষায় অত্যন্ত ভালো ফলাফল নিয়ে পাশ করেছিলেন এবং একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ( physics, chemistry, math) নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। এছাড়াও তিনি একজন থিয়েটার শিল্পী ছিলেন এবং ওড়িশায় গিয়েও নাটক পরিবেশন করে পুরস্কার জিতেছিলেন। ২০১৮ সালের ৩১ আগস্ট সাকিব এবং তার ১৪ বছর বয়সী বন্ধু মুদাসির রশিদ পারে হঠাৎ করেই উত্তর কাশ্মীরের বান্ডিপোরার হাজিন এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়ে যান। তারা দুজনেই লস্কর-ই-তৈয়বায় যোগ দেন বলে জানা যায়। সাকিবের পরিবার কখনোই বুঝতে পারেনি কেন সে এই পথ বেছে নিয়েছিলেন, কারণ সে ফুটবল খেলতেন এবং ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। নিখোঁজ হওয়ার কয়েক মাস পর, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে শ্রীনগরের মুজগুন্ড এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ১৮ ঘণ্টা ধরে চলা এক বন্দুকযুদ্ধে সাকিব বিলাল শেখ নিহত হন। ছবিতে যে কিশোর বোমা বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন, বাস্তব জীবনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তিনি প্রাণ হারান। তাঁর মামা আজিম আইজাজের মতে, সাকিবের কোনো অভিযোগ বা কোনো উগ্র মানসিকতার লক্ষণ ছিল না। তিনি ফুটবল খেলতে ভালোবাসতেন এবং গান ও ভালো খাবারের প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। এমনকি সাকিবের পরিবারের কোনো সদস্যই জানতেন না যে তিনি বা তাঁর বন্ধু কট্টরপন্থী মতাদর্শে দীক্ষিত হয়েছেন।
সাকিবের এই ট্র্যাজেডি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, সঠিক দিশার অভাবে কীভাবে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র অকালেই কক্ষচ্যুত হতে পারে। যে হাতে কলম কিংবা ক্যামেরা থাকার কথা ছিল, সেই হাতে বন্দুক তুলে নেওয়ার এই সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত কেবল এক বুক হাহাকারই উপহার দিয়েছে। সাকিবের এই কাহিনী তাই কেবল এক অভিনেতার গল্প নয়, এটি এক ঝরে যাওয়া সম্ভাবনার শোকগাথা।

