স্বাগত ১৪৩৩: নতুন সূর্যে বাঙালির নতুন পথচলা।
অনন্যা ব্যানার্জী, কলকাতা: কালবৈশাখীর ঝাপটায় ধুলোবালি ও জীর্ণতাকে উড়িয়ে দিয়ে বাঙালির হৃদয়ে আজ নতুনের আবাহন। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে প্রকৃতি আজ সেজেছে বাসন্তী সাজে, আর বাঙালির রন্ধ্রে রন্ধ্রে বেজে উঠেছে সেই চিরচেনা সুর— ‘এসো হে বৈশাখ’। কোনো বিভেদ নয়, কোনো সীমানা নয়; কেবল জাতিগত ঐতিহ্যের টানে আজ কোটি প্রাণ একীভূত হয়েছে পহেলা বৈশাখের এই মহামিলন মেলায়। বঙ্গাব্দ ১৪৩৩-এর প্রথম সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই নতুন এক সংকল্পে পথচলা শুরু হলো এক অসাম্প্রদায়িক ও সমৃদ্ধ আগামীর প্রত্যাশায়।
দিনের শুরুতেই রাজধানীর রমনা বটমূলে ছায়ানটের শিল্পীদের কণ্ঠে ভোরের রাগে নতুনের আবাহন ধ্বনিত হয় । শত শত মানুষের উপস্থিতিতে প্রকৃতির শীতল ছায়ায় বর্ষবরণ উৎসব পূর্ণতা পায় ধ্রুপদী সংগীত আর কবিতার মূর্ছনায়। এরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের করা হয় ইউনেস্কো স্বীকৃত ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রা। এবারের শোভাযাত্রায় সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও লোকজ ঐতিহ্যের মিশেলে তৈরি নানা মটিফ, বড় বড় মুখোশ এবং পাখির অবয়ব অপশক্তির বিনাশ ও বিশ্ব শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেয় ।
শহরের ইট-পাথরের দেয়াল ছাপিয়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম-বাংলার মেঠো পথেও। বিভিন্ন স্থানে বসেছে বৈশাখী মেলা, যেখানে মাটির পুতুল, বেতের ঝুড়ি আর নকশি কাঁথার মতো দেশীয় পণ্যের পসরা সাজিয়েছেন কারিগররা । নাগরদোলা আর জারি-সারির সুরে মুখরিত এই মেলাগুলো যেন এক টুকরো শেকড়ের সন্ধান দিচ্ছে যান্ত্রিক জীবনে।
বাঙালির এই উৎসব কেবল আনন্দেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক নতুনত্বেরও বার্তা বহন করে। ব্যবসায়ীরা তাদের পুরনো হিসাব চুকিয়ে লাল কাপড়ে মোড়ানো নতুন খাতা বা ‘হালখাতা’ খুলছেন দোকানে দোকানে ক্রেতাদের মিষ্টি মুখ করানো আর শুভকামনা বিনিময়ের মাধ্যমে ব্যবসায়িক সুসম্পর্ক নবায়নের এক অনন্য দৃশ্য দেখা গেছে প্রতিটি বাজার।
খাদ্যাভ্যাস ও পোশাকের বর্ণিল সাজ
পহেলা বৈশাখের পূর্ণতা আসে পান্তা-ইলিশের আয়োজনে, যা আজ বাঙালির ঘরে ঘরে উৎসবে পরিণত হয়েছে । সাদা শাড়িতে লাল পাড় আর পাঞ্জাবিতে সেজে আট থেকে আশি—সব বয়সের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছেন । কপালে টিপ আর গালে এক মুখ জুড়ে হাসি।‘শুভ নববর্ষ’ আল্পনায় মেতে ওঠা তরুণ-তরুণীদের উচ্ছ্বাস দিনটিকে করেছে আরও উৎসবমুখর ।
দিনশেষে পহেলা বৈশাখ কেবল একটি তারিখ পরিবর্তনের গল্প নয়, বরং এটি বাঙালির জাতিসত্তার নবায়নের এক চিরন্তন উৎসব। সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে পড়বে এবং উৎসবের রঙিন আল্পনাগুলো গোধূলির আলোয় মিশে যাবে, তখনো প্রতিটি হৃদয়ে থেকে যাবে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। হাজার বছরের এই ঐতিহ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে—যতই বিভেদ আসুক, শেকড়ের টানে আমরা বারবার এক হতে জানি। পহেলা বৈশাখের এই অজেয় চেতনা কেবল একদিনের জন্য নয়, বরং বছরজুড়ে আমাদের পথ চলায় সাহস জোগাক—এমনই স্বপ্ন নিয়ে বিদায় নিচ্ছে ১৪৩৩-এর প্রথম দিনটি।

