Thursday, May 14, 2026
- Advertisement -

বাঁকুড়া জেলার সোনামুখী ব্লকের ডিহিপাড়া গ্রামের এক সাধারণ গৃহবধূ থেকে আজ নারী স্বনির্ভরতার এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছেন মোনালিসা

- Advertisement -

 

নিজস্ব সংবাদদাতা, বাঁকুড়া:— বাঁকুড়া জেলার সোনামুখী ব্লকের ডিহিপাড়া গ্রামের এক সাধারণ গৃহবধূ থেকে আজ নারী স্বনির্ভরতার এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছেন “মোনালিসা” স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সভানেত্রী শ্রীমতী ছবিতা প্রামাণিক। নারী ক্ষমতায়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোগ উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সম্প্রতি তিনি পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় রাজ্যপালের হাত থেকে সম্মাননা লাভ করেছেন। এই সম্মান শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং গ্রামীণ নারীদের আত্মনির্ভরতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

 

২০০১ সালে মাত্র ১০ জন মহিলাকে নিয়ে “ডিহিপাড়া মোনালিসা স্বনির্ভর গোষ্ঠী”র পথচলা শুরু হয়। সীমিত সামর্থ্য, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক বাধা—সবকিছুকে সঙ্গে নিয়েই শুরু হয়েছিল এই সংগ্রাম। ২০০৩ সালে ৫০ হাজার টাকার ঋণ নিয়ে জমি লিজে নিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোগের মাধ্যমে গোষ্ঠীর কার্যক্রম শুরু করেন ছবিতা প্রামাণিক। ধীরে ধীরে সেই ছোট উদ্যোগই আজ বিশাল আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে এই গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ৩৫০০-রও বেশি মহিলা সদস্য।

বর্তমানে গোষ্ঠীর মাধ্যমে চাল ব্যবসা, বাদাম তেল ও সরষের তেল উৎপাদন, লংকা -জিরে-ধনে মসলা প্রস্তুত , চারাপোনা মাছ চাষ, স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি ও বিক্রির মতো একাধিক উদ্যোগ সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সমস্ত কাজই মূলত গ্রামের মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত হয়। ফলে বহু মহিলা আজ আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হয়ে নিজেদের পরিবার ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

 

২০০৮ সাল থেকে ছবিতা প্রামাণিক সোনামুখী কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র (KVK)-এর সঙ্গে যুক্ত হন। KVK-এর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে তিনি SRI পদ্ধতিতে ধান চাষ, বর্ষাকালে পেঁয়াজ চাষ, আধুনিক পদ্ধতিতে পশুপালন, সবজি চাষ, মাশরুম উৎপাদন, গোবর সার প্রস্তুত ও ব্যবহার, ছাগল পালন সহ একাধিক কৃষি ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোগে দক্ষতা অর্জন করেন। এই জ্ঞান ও প্রযুক্তি তিনি শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং গোষ্ঠীর অন্যান্য সদস্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিয়েছেন।

 

২০২৩ সালে KVK-এর সহায়তায় তিনি বিনামূল্যে চাল তৈরির ঢেঁকি মেশিন পান। সেই ঢেঁকি ছাঁটা চাল ইতিমধ্যেই “বিশ্ব বাংলা” প্ল্যাটফর্মে বিপুল পরিমাণে বিক্রি হয়েছে, যা স্থানীয় উৎপাদনকে রাজ্যের বৃহত্তর বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

 

ছবিতা প্রামাণিকের সাফল্যের স্বীকৃতি বহুবার এসেছে বিভিন্ন স্তর থেকে। SRI পদ্ধতিতে ধান চাষে সাফল্যের জন্য ২০১৩ সালে KVK-এর সহায়তায় তিনি দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাত থেকে সম্মান গ্রহণ করেন। এছাড়াও বর্ষাকালে পেঁয়াজ চাষে সাফল্যের জন্য ICAR, দিল্লি থেকে পুরস্কার পেয়েছেন। রাজ্য সরকারের তরফ থেকেও একাধিকবার তিনি সম্মানিত হয়েছেন।

 

বর্তমানে তাঁর উদ্যোগ থেকে বছরে প্রায় ১০ থেকে ১২ লক্ষ টাকার নেট লাভ হচ্ছে। কিন্তু শুধুমাত্র আর্থিক সাফল্যই নয়, তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো হাজার হাজার মহিলাকে আত্মনির্ভর করে তোলা। যেসব মহিলা একসময় সংসারের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন, আজ তাঁরাই বিভিন্ন উৎপাদনমূলক কাজে যুক্ত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন।

 

ছবিতা প্রামাণিক জানিয়েছেন, ভবিষ্যতেও কোনো স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা মহিলা দল যদি তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়, তবে সঠিক প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতার মাধ্যমে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে তিনি সর্বদা প্রস্তুত। তাঁর এই উদ্যোগ ও মানসিকতা গ্রামীণ সমাজে নারী উন্নয়নের নতুন দিশা দেখাচ্ছে।

 

ডিহিপাড়ার এই সাফল্যের গল্প আজ শুধু বাঁকুড়া নয়, সমগ্র বাংলার গ্রামীণ নারী সমাজের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম। ছবিতা প্রামাণিক প্রমাণ করে দিয়েছেন—ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম এবং সঠিক প্রশিক্ষণ থাকলে গ্রামের মহিলারাও সমাজ ও অর্থনীতির পরিবর্তনের অন্যতম শক্তি হয়ে উঠতে পারেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments