যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে এই সাধারণ ভুলগুলো দাম্পত্য জীবনে প্রভাব ফেলছে না তো
অনন্যা ব্যানার্জী, কলকাতা: — মানুষের আদিমতম প্রবৃত্তিগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও ‘যৌনতা’ আজও আমাদের সমাজে এক বিশাল আড়ষ্টতা ও গোপনীয়তার নাম। পর্যাপ্ত বিজ্ঞানসম্মত আলোচনার অভাব এবং লোকলজ্জার ভয়ে যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে পুরুষ ও নারী উভয়ের মধ্যেই ডালপালা মেলেছে অসংখ্য ভ্রান্ত ধারণা বা ‘মিথ’।
কখনো লোকমুখে শোনা কথা, আবার কখনো ইন্টারনেটের ভুল তথ্য এই বিভ্রান্তিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অথচ সঠিক তথ্যের অভাবে অনেক সময় সুস্থ দাম্পত্য জীবনে ফাটল ধরে, এমনকি তৈরি হয় দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ও শারীরিক জটিলতা। এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য হলো—যৌনতা নিয়ে আমাদের মনের গভীরে গেঁথে থাকা সেই সব প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদ করা এবং সুস্থ ও স্বাভাবিক যৌন জীবন সম্পর্কে সঠিক দিশা দেওয়া।
যৌনতা এবং যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজে বিজ্ঞানসম্মত আলোচনার অভাব থাকায় নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই নানা ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে।
অনেক পুরুষ মনে করেন তাদের যৌনাঙ্গ ছোট, যা মিলনে বাধা হতে পারে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৫ শতাংশ নারী তাদের সঙ্গীর যৌনাঙ্গের আকারে সন্তুষ্ট এবং আকার যৌন তৃপ্তির একমাত্র মাপকাঠি নয়।
অনেকের ধারণা বীর্যপাত হলে শরীর দুর্বল হয়ে যায় বা এটি শরীরের ‘সারবস্তু’। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটি একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া এবং এর সাথে শারীরিক শক্তির স্থায়ী ক্ষতির কোনো সম্পর্ক নেই ।
ধারণা করা হয় পুরুষরা সবসময় যৌনতার জন্যএ প্রস্তুত থাকে। বাস্তবে মানসিক চাপ, ক্লান্তি বা হরমোনের পরিবর্তনের কারণে পুরুষদেরও যৌন আকাঙ্ক্ষা কম হতে পারে।
অনেকেই মনে করেন প্রথমবার মিলনে গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এটি সম্পূর্ণ ভুল; সুরক্ষিত পদ্ধতি ব্যবহার না করলে প্রথমবারও গর্ভধারণ হতে পারে। আবার একটা নির্দিষ্ট সময় আছে বায়োলজিক্যাল এ পিরিয়ডের 3-4 দিন আগে এবং পরবর্তী সময়ে, সম্পর্ক তৈরির জন্য নিরাপদ মানা করা যায় এই সময়ে ফর্টাইল হয় না।
অনেকের ধারণা মিলনের সময় নারীরা সবসময় অর্গাজম অনুভব করেন। বাস্তবে অনেক নারীর ক্ষেত্রে এটি নিয়মিত হয় না এবং এর সাথে পুরুষ সঙ্গীর সক্ষমতার চেয়ে মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য বেশি জড়িত।
অনেকসময় নারীরা যৌন মিলনের আগে ভেবে থাকে তার পেটের চর্বি তাকে দেখতে কেমন লাগছে সঙ্গীর কাছে সে কি আকর্ষণীয় হতে পারবে এসব ভাবনা মন থেকে দূরে সরান। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ভাবনায় পড়ে থাকলে আপনার অর্গাসম ঠিক ঠাক ভাবে নির্গত হতে বাধা দেয় আর আপনি পুরোপুরি ভাবে বিষয়টিকে আনন্দের সাথে নিতে পারবেন না।
অনেকে মনে করেন লক্ষণ না থাকলে যৌনরোগ নেই। আসলে বেশিরভাগ যৌনরোগের কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ থাকে না, তাই নিয়মিত পরীক্ষা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
মিলনের শেষ মুহূর্তে পুরুষাঙ্গ সরিয়ে নেওয়া গর্ভধারণ রোধে ১০০% কার্যকর নয়, কারণ বীর্যপাতের আগেও সামান্য তরল (Pre-cum) নির্গত হতে পারে যাতে শুক্রাণু থাকে।যৌনতাকে কেবল শারীরিক বিষয় মনে করা হয়। কিন্তু উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা মানসিক চাপ যৌন জীবনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক যৌনশিক্ষাই পারে এই সামাজিক জড়তা ও ভ্রান্তি দূর করতে।
যৌনতা কেবল একটি শারীরিক চাহিদা নয়, বরং এটি শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা বা ‘মিথ’গুলো অনেক সময় অহেতুক ভীতি, হীনম্মন্যতা এবং দাম্পত্য কলহের জন্ম দেয়। বিজ্ঞানের এই যুগে লোকমুখে শোনা কথায় কান না দিয়ে সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করা জরুরি।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য বিজ্ঞানসম্মত যৌনশিক্ষা এবং খোলামেলা আলোচনার সুযোগ থাকা প্রয়োজন, যাতে তারা কোনো বিভ্রান্তির শিকার না হয়। মনে রাখতে হবে, সঠিক তথ্যই পারে সব জড়তা ভেঙে একটি সুস্থ, সুন্দর ও আত্মবিশ্বাসী জীবন গড়ে তুলতে। কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যায় লোকলজ্জা কাটিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই আমাদের প্রথম পদক্ষেপ।

