নিজস্ব প্রতিনিধি মুর্শিদাবাদ:- মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙ্গা -১ ব্লক রাজ্যের অন্যতম সর্ষে চাষের এলাকা হিসেবে সুপরিচিত। সর্ষের পাশাপাশি মরশুমি সবজি, পাট, তিল এবং পশুপালন গ্রামবাসীর মূল জীবিকা। পাশাপাশি এই জেলার নির্মাণকর্মীর সুনাম ও দক্ষতা সর্বজনবিদিত। ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময় রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন এই ব্লকে ধারাবাহিকভাবে মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা সহ কৃষি ও পশুপালনের মাধ্যমে জীবিকা বিকাশ কার্যক্রম গ্রহণের আগে অবশ্য সর্ষে চাসে যুক্ত কৃষকরা মূলতঃ আধুনিক ও ব্যয় সাশ্রয়ী কৃষি সম্পর্কে বিশেষ অবগত ছিল না। ফলে পুঁজি বিনিয়োগ ও পরিশ্রমের তুলনায় মুনাফার পরিমান অনেকটাই কম ছিল। বেলডাঙা-১ ব্লকের খিদিরপুর-হালালপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষকরা আজ রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন-এর প্রশিক্ষণ সহায়তায় বাণিজ্যিকভাবে সর্ষে চাষ করে উৎপাদনের পরিমান প্রায় দ্বিগুন করতে সক্ষম হয়েছে। আজ আমরা খিদিরপুর-হালালপুর ক্লাস্টারের এরকম চার জন সফল কৃষকের উদাহরণ তুলে ধরবো যাঁরা যৌথ উদ্যোগে সর্ষে চাষ করে লাভবান হয়েছে।
কুশ দাস (৪৫), খিদিরপুর-হালালপুর গ্রামের কৃষক। উচ্চ মাধ্যমিক উর্ত্তীর্ণ কুশ প্রায় দু দশক করে সক্রিয় কৃষি কাজের সাথে যুক্ত। পরিবারের সদস্য সংখ্যা চার জন। আগে কুশ মূলতঃ এক ফসলি চাষ করতেন, কিন্তু কোনো কারণে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হলে পুরোটাই ক্ষতি হতো। কিন্তু বর্তমানে বহু ফসলি চাষে যুক্ত। মোট কৃষি জমির পরিমান চার বিঘা – এর মধ্যে গত মরশুমে আড়াই বিঘা জমিতে সর্ষে চাষ করেছেন। কুশ রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের সম্পর্কে জানতে পারেন ২০২২ সালে সারগাছি কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের মাধ্যমে। আগে কুশ স্থানীয় জাতের বীজ ব্যবহার করতেন এবং গ্রামের অন্যান্য কৃষকদের মতোই প্রথাগত সেচ ও সারের প্রয়োগ করতেন। কিন্তু রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের কৃষি প্রশিক্ষণ থেকে লব্ধ শিক্ষা নিয়ে গত বছর ” শিবানী ” জাতের সর্ষে বীজ ব্যবহার করেন এবং নিয়মিত হেল্পলাইন এর মাধ্যমে কৃষি বিজ্ঞানীদের সাথে আলোচনা করে সেচ ও সারের প্রয়োগ করেন – বিশেষ করে শস্য ব্যবস্থাপনা ও বোরন স্প্রে সম্পর্কে। ফলস্বরূপ আগে উৎপাদন হতো বিঘা প্রতি গড়ে ১.৭৫ কুইন্টাল, কিন্তু রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের প্রশিক্ষণের পর উৎপাদন বেড়ে হয়েছে বিঘা প্রতি প্রায় ২.৭৫ কুইন্টাল। স্থানীয় বীজের উৎপাদনের দাম ছিল ৩৫০০/- থেকে ৪০০০/- টাকা প্রতি কুইন্টাল, বর্তমানে সর্ষের গুণমান বৃদ্ধির ফলে দাম পাচ্ছে ৪৫০০/- থেকে ৫০০০/- টাকা প্রতি কুইন্টাল। অর্থাৎ একদিকে যেমন উৎপাদন বেড়েছে, অন্যদিকে সর্ষের গুণমান বৃদ্ধির ফলে লাভের পরিমাণ বেড়েছে কয়েক গুন। আগে গড় আয় ছিল প্রায় ৭০০০/- টাকা, বর্তমানে ১৩,৭৫০/- টাকা।
এই গ্রামেরই আরেকজন উপকৃত কৃষক অসীম নন্দী (৪৯) । মাধ্যমিক উত্তীর্ণ অসীমের পরিবারের সদস্য সংখ্যা চার জন। মোট জমি চার বিঘা – এর মধ্যে গত মরশুমে আড়াই বিঘা জমিতে রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের বিশেষজ্ঞের সুপারিশ মতো শিবানী প্রজাতির সর্ষে চাষ করেছেন। প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান এবং পরবর্তীকালে হেল্পলাইন পরিষেবার মাধ্যমে নিয়মিত ভাবে সর্ষে চাষের বিষয়গুলি লব্ধ করেন – যেমন, জমি তৈরি, জৈব সারের প্রয়োগ, নবরত্ন DAP সারের পরিমান ও প্রয়োগ পদ্ধতি, বোরন স্প্রে ইত্যাদি। পাশাপাশি ঘন কুয়াশার কারণে সর্ষের ফুল ঝরে যাচ্ছিলো, বিশেষজ্ঞের পরামর্শমতো অসুধ প্রয়োগ করে সফল হন। অসীমের উৎপাদন আগে বিঘা প্রতি ১.৭৫ কুইন্টালের আশপাশেই হতো, কিন্তু রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের তত্বাবধানে এ বছর উৎপাদনের পরিমান হয়েছে বিঘা প্রতি প্রায় ২.৬০ কুইন্টাল। রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে অসীম বলেন ” সময়মতো সঠিক উৎস থেকে সঠিক তথ্য আজ আমার সর্ষে চাষ থেকে শুধু মুনাফাই বাড়ে নি, বেড়েছে চাষের দক্ষতা”। (অসীম নন্দী : ৯৭৩২৪৪৮৪৬৮৫)
অর্জুন নন্দী (৬২), খিদিরপুর-হালালপুর গ্রামের বরিষ্ঠ কৃষক। অষ্টম মান উত্তীর্ণ অর্জুন বাবু দীর্ঘ চার দশক কৃষি ও পশুপালনের সাথে যুক্ত। পরিবারের সদস্য সংখ্যা তিন জন। অর্জুন বাবু প্রায় পাঁচ বিঘা কৃষি জমির মালিক – যার মধ্যে এ বছর দুই বিঘা জমিতে সর্ষে চাষ করেছেন শিবানী প্রজাতির বীজ ব্যবহার করে। অর্জুন বাবুও বীজ ব্যবহারের পাশাপাশি সারের ব্যবহার, বোরন স্প্রে এবং সেচের খুঁটিনাটি বিষয়গুলি রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন থেকে জানেন। পাশাপাশি ঘন কুয়াশার কারণে সর্ষের ফুল ঝরে যাচ্ছিলো, বিশেষজ্ঞের পরামর্শমতো অসুধ প্রয়োগ করে সফল হন। এছাড়া অন্য সবজিতে সাদা মাছির আক্রমণে ফসলের ক্ষতি হচ্ছিলো, সেই সমস্যাও ফাউন্ডেশনের অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের সুপারিশ নিয়ে সমাধান করেন। আগে অর্জুন বাবুর উৎপাদন হতো বিঘা প্রতি প্রায় ১.৪ কুইন্টালের মতো। বর্তমানে উৎপাদন বেড়ে হয়েছে বিঘা প্রতি প্রায় তিন কুইন্টাল। স্থানীয় সারগাছি বাজারে প্রায় ৪৫০০/- টাকা কুইন্টাল দরে সর্ষে বিক্রি করেছেন। (অর্জুন নন্দী : ৯৭৩৫৪৩১৫১৮)
রাজেশ পাল (৩২), খিদিরপুর-হালালপুর গ্রামের একজন উদীয়মান কৃষক। স্বপ্ন কৃষি উদ্যোগী হওয়ার। স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ রাজেশ চাকরির শত চেষ্টা করেও সফল না হয় পারিবারিক কৃষকাজে মনোনিবেশ করেন। রাজেশের পরিবারের সদস্য সংখ্যা সাত জন। মোট কৃষি জমি পাঁচ বিঘা। রাজেশ রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন সম্পর্কে জানতে পারেন ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময় গ্রামেরই এক কৃষক ভাইয়ের কাছ থেকে। এরপর নিয়মিত কৃষি প্রশিক্ষণ ও হেল্পলাইন পরিষেবা থেকে আধুনিক কৃষি তথ্য লব্ধ করে বাণিজ্যিক ভাবে সবজি, ধান ও সর্ষে চাষ করেছেন। রাজেশ এ বছর তিন বিঘা জমিতে শিবানী প্রজাতির বীজ ব্যবহার করে সর্ষে চাষ করেছেন। পাশাপাশি কীট নিয়ন্ত্রণের খুঁটিনাটি বিষয়গুলিও বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে রপ্ত করেছেন। আগে যেখানে দু বিঘা জমিতে সর্ষে উৎপাদনের পরিমান ছিল বিঘা প্রতি ১.৫০ কুইন্টালের কাছাকাছি, এ বছর উৎপাদন হয়েছে প্রায় বিঘা প্রতি ৩.০০ কুইন্টালের কাছাকাছি। বাজার মূল্য প্রায় ৪৫০০/- থেকে ৫০০০/- টাকা প্রতি কুইন্টাল। রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন থেকে উপকৃত রাজেশ বলেন ” আগে মাটি পরীক্ষা না করে কৃষি কাজ করার জন্য আমরা ঘরোয়া জ্ঞান সম্বল করে বীজ সার প্রয়োগ করতাম, কিন্তু বর্তমানে মাটি পরীক্ষা করে চাষ করার জন্য একদিকে বেড়েছে উৎপাদন, পাশাপাশি বেড়েছে মাটির উর্বরতা ”
রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন পরিবার আজ প্রকৃত অর্থেই গ্রাম-বাংলার কৃষকদের জীবিকা বন্ধু। ক্লাস্টার চিহ্নিত করে এলাকার চাহিদা অনুসারে কৃষকদের কাছে পরিষেবা পৌঁছে দিয়ে গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতি শক্তিশালী করার কাজে নিয়োজিত রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন।

