অনিয়মিত বৃষ্টির মধ্যেও আশার আলো: বাঁকুড়ায় খরিফ পেঁয়াজ চাষে উন্নত প্রযুক্তির সাফল্য
নিজস্ব সংবাদদাতা:- পেঁয়াজ আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় রান্নাঘরের অন্যতম প্রধান উপকরণ। কিন্তু প্রতি বছর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে বাজারে পেঁয়াজের জোগানে ঘাটতি দেখা যায়, যার ফলে দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে খরিফ মরশুমের পেঁয়াজ উৎপাদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র, বাঁকুড়া (KVK Bankura) জানিয়েছে, জেলার তাপমাত্রা ও আবহাওয়া দেরিতে খরিফ পেঁয়াজ চাষের জন্য যথেষ্ট উপযোগী, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন অনিয়মিত বৃষ্টিপাত চাষের ধরন বদলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঁকুড়ায় দেরিতে খরিফ পেঁয়াজ চাষ করলে ফসল জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে তোলা যায়। অন্যদিকে রবি মরশুমের উৎপাদিত পেঁয়াজের বড় অংশ সাধারণত সংরক্ষণ করে অক্টোবর মাস পর্যন্ত গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করা হয়। ফলে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাজারে যে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়, তা পূরণ করতে খরিফ পেঁয়াজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। এতে যেমন ভোক্তাদের চাহিদা মেটানো সম্ভব, তেমনই বাজারদর নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা মেলে।
বর্তমানে ভারতে খরিফ পেঁয়াজ চাষ মূলত হাতে গোনা কয়েকটি রাজ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু এর অর্থনৈতিক ও বাজারগত গুরুত্ব বিচার করে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যেও এই চাষকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার বলে মনে করছেন কৃষিবিজ্ঞানীরা। এ বিষয়ে বাঁকুড়া জেলা অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বলেই জানিয়েছে KVK Bankura।
কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র, বাঁকুড়া কর্তৃক পরিচালিত প্রদর্শনীতে দেখা গিয়েছে যে, উন্নত জাতের পেঁয়াজ NHRDF Agrifound Dark Red চাষে কৃষকদের প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় গড়ে ১৯.৯১ শতাংশ বেশি ফলন পাওয়া গেছে। প্রদর্শনীর ফলাফলে আরও দেখা যায়, গড় extension gap ছিল ৪৫.৫৭ কুইন্টাল/হেক্টর, যা প্রমাণ করে যে উন্নত বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি গ্রহণ করলে উৎপাদন আরও অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণেও এই উন্নত প্রযুক্তির সাফল্য স্পষ্ট। প্রদর্শনী প্লটে গড় মোট আয় ছিল ২,৭৭,৪৫৩.৩ টাকা/হেক্টর, নিট আয় ১,৯১,১৮৪ টাকা/হেক্টর, এবং লাভ-খরচ অনুপাত (B:C ratio) ছিল ৩.২। অন্যদিকে কৃষকদের প্রচলিত জাত N-53-এ মোট আয় ছিল ২,০৪,১৬০ টাকা/হেক্টর, নিট আয় ১,২২,৪২৩.৩ টাকা/হেক্টর, এবং লাভ-খরচ অনুপাত ছিল ২.৫। অর্থাৎ উন্নত জাত ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা কৃষকদের কাছে বেশি লাভজনক প্রমাণিত হয়েছে।
KVK Bankura-র বিজ্ঞানীদের মতে, খরিফ পেঁয়াজ চাষে সঠিক জাত নির্বাচন, উপযুক্ত সময়ে চারা রোপণ, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, রোগ-পোকা দমন, এবং সঠিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষত অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের সময় জমিতে জল দাঁড়িয়ে গেলে পেঁয়াজ গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাই জমি নির্বাচন ও নিকাশির দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাঁকুড়া জেলায় যদি পরিকল্পিতভাবে খরিফ পেঁয়াজ চাষ বাড়ানো যায়, তাহলে শুধু কৃষকদের আয়ই বাড়বে না, একই সঙ্গে রাজ্যে পেঁয়াজের ঘাটতি কমবে এবং উৎসবের মরশুমে বাজারদরও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। উন্নত জাত NHRDF Agrifound Dark Red এবং বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে বাঁকুড়া খরিফ পেঁয়াজ উৎপাদনে আগামী দিনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

