Friday, September 18, 2026
- Advertisement -

প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে বাপি ফকিরের BA পাশ, শুয়ে শুয়েই পড়াশোনা ও নিজের খরচ চালানোর লড়াই

- Advertisement -

 

প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে মগরাহাটের বাপি ফকিরের BA পাশ, শুয়ে শুয়েই পড়াশোনা ও নিজের খরচ চালানোর লড়াই

বাইজিদ মন্ডল দক্ষিন চব্বিশ পরগনা:-  মগরাহাট পূর্বের ডিহি কলস শুঁড়িপুকুরের বাসিন্দা বাপি ফকির। জন্ম থেকেই তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে জীবনযাপন করছেন।

হাঁটাচলা তো দূরের কথা, নিজের শরীরের হাত-পাও নাড়াচাড়াও তাঁর পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। হাত-পা বাঁকা। সামান্য বেশি আঘাত লাগলেও হাড় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। চিকিৎসকেরাও তাঁর পরিবারকে জানিয়েছিলেন, তাঁর হাত-পা অত্যন্ত ভঙ্গুর।

কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনও তাঁর পড়াশোনার ইচ্ছাকে থামাতে পারেনি। অভাবের সংসারে মা সেরিনা বিবি ছোটবেলা থেকেই ছেলের পড়াশোনার স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। বাপিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর পর প্রতিদিন মা কোলে করে তাঁকে স্কুলে নিয়ে যেতেন। নিজের পায়ে হাঁটতে না পারলেও পড়াশোনা করার প্রবল ইচ্ছা ছিল বাপির।

 

প্রাইভেট শিক্ষকের খরচ বহন করার সামর্থ্য ছিল না পরিবারের। তাই নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করতে শুয়ে শুয়েই লাইনের জাল তৈরি করতেন বাপি। সেই কাজ থেকে পাওয়া সামান্য টাকা দিয়ে ব্যাগ, বই, খাতা এবং পড়াশোনার অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতেন।

ক্লাস ফোরে ওঠার পর বাপির ইচ্ছা হয় প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পড়ার। তাঁর মায়ের চেষ্টায় সন্ধান মেলে শিক্ষক সমীর মণ্ডলের। এরপর মাধ্যমিক পর্যন্ত সামান্য পারিশ্রমিকেই বাপিকে পড়িয়েছেন তিনি। বাপির কথায়, তাঁর পড়াশোনার পথে সমীর মণ্ডল স্যারের অবদান তিনি কখনও ভুলবেন না। উচ্চশিক্ষার পথেও একই রকম সংগ্রাম চলেছে। কলস হাই স্কুলে পড়ার সময় প্রথমদিকে মা কোলে করে তাঁকে স্কুলে নিয়ে যেতেন। পরে হুইলচেয়ারে করে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁর ভাই সামিম ফকির, জাহির লস্কর, মিরাজ মোল্লা-সহ আরও অনেকে। ২০২০ সালে বেঞ্চে শুয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেন বাপি ফকির। কোনও রাইটার না নিয়েই পরীক্ষায় ৩১২ নম্বর পান। এরপর ২০২২ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় তাঁর প্রাপ্ত নম্বর ৩৭১।

 

এরপর ২০২২ সালে ভর্তি হন মগরাহাট কলেজে। বাড়ি থেকে কলেজের দূরত্ব প্রায় ২ কিলোমিটার। প্রতিদিন হুইলচেয়ারে করে কলেজে যেতেন তিনি। তাঁকে কলেজে নিয়ে যাওয়ার কাজে সহযোগিতা করেছেন রাকিবুল গাজি, মিরাজ মোল্লা, সারোয়ার হোসেন ফকির, আব্দুল সামাদ গাজি-সহ তাঁর বন্ধুরা। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০২৬ সালে মগরাহাট কলেজ থেকে BA পাশ করেছেন বাপি ফকির। তাঁর কাছে এই সাফল্য শুধু একটি ডিগ্রি নয়, বরং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ফল।

 

বাপি জানান, তিনি প্রতিদিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পড়াশোনা করেন। পাশাপাশি যতটা সময় পান, শুয়ে শুয়েই লাইনের জাল তৈরি করেন। কারণ নিজের পড়াশোনার খরচের একটা অংশ তাঁকেই জোগাড় করতে হয়।

 

বাপির জীবনযাপন এখনও অত্যন্ত কঠিন। তিনি হাঁটাচলা করতে পারেন না।সারাদিন-রাত শুয়েই থাকতে হয়। খাওয়া, স্নান,পড়াশোনা,জীবনের প্রায় প্রতিটি কাজই শুয়ে করতে হয়। তবুও স্কুল ও কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং বন্ধুরা সবসময় তাঁকে সহযোগিতা করেছেন। শিক্ষকরা তাঁকে ভালোবেসে নোট ও সাজেশন দিয়েছেন, বন্ধুরাও বিভিন্ন সময় পাশে দাঁড়িয়েছেন।

 

বাপি বলেন, “আমি ১০০ শতাংশ প্রতিবন্ধী। হাঁটাচলা করতে পারি না। কখনও ভাবিনি এই অবস্থায় BA পাশ করতে পারব। যারা আমার পড়াশোনার পথে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেককে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।”

 

বর্তমানে তিনি প্রতিবন্ধী ভাতা পান। তবে তাঁর দাবি, এর বাইরে আর কোনও উল্লেখযোগ্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা তিনি পান না। তাই ভবিষ্যৎ জীবন কীভাবে চলবে, তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

 

বাপির আবেদন, সরকার যদি তাঁর মতো প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য আরও সহযোগিতা ও স্বনির্ভরভাবে জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করে, তাহলে তিনি নিজের পায়ে না হাঁটতে পারলেও নিজের জীবনটা স্বাধীনভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন। বাপি ফকিরের ঠিকানা: গ্রাম ডিহি কলস শুঁড়ি পুকুর থানা—মগরাহাট পোস্ট কলস বাজার,মা সেরিনা বিবি,বাবা সাজাহান ফকির।

পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে বাপি তিন ভাই ও দুই বোনের একজন। তাঁর জীবনের এই লড়াই প্রমাণ করে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং মানুষের সহযোগিতা থাকলে শিক্ষার পথ থেমে থাকে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments