অন্ধকারে লুকিয়ে কে! এই গভীর রাতের মায়াবিনী?
অনন্যা ব্যানার্জী, কলকাতা : রাত যখন দুইটো কি তিনটে, চারপাশ যখন নিস্তব্ধ। নিঝুম রাত। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাপিয়ে হঠাৎ ভেসে এল এক চেনা কণ্ঠস্বর।পরিচিত কোনো কণ্ঠস্বর যদি মাঝরাতে আপনার নাম ধরে দুবার ডাকে, আপনি কি সাড়া দেবেন? হতে পারে সে আপনার মা, বাবা, স্ত্রী কিংবা পরম কোনো বন্ধু।
গ্রাম বাংলার প্রাচীন লোককথা বলছে, এই পরিচিত কণ্ঠস্বর আসলে কোনো প্রিয় মানুষের নয়, বরং এক অশুভ ছায়া বা নিশির ডাক। লোকজনের বিশ্বাস অনুযায়ী, নিশি কখনোই তিনবার ডাকতে পারে না, তার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ মাত্র দুটি ডাকে। কিন্তু যারা সেই ডাকে সাড়া দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছেন, তাদের অধিকাংশেরই আর কোনো হদিস মেলেনি। এই রহস্যময় সত্তাটি মানুষের অবিকল কণ্ঠস্বর নকল করতে পারে। এটি আপনাকে একবার ডাকবে, আপনি উত্তর দেবেন না। দ্বিতীয়বার ডাকবে, আপনি দ্বিধায় পড়বেন।
লোককথা বা তান্ত্রিকতত্ত্ব অনুযায়ী, নিশি হলো এক প্রকার ‘অতৃপ্ত আত্মা’ বা ‘অশরীরী সত্তা’। বাংলার গ্রামীণ মিথলজিতে একে ডাইনি বা প্রেতাত্মার একটি রূপ মনে করা হয়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রাচীনকালে যখন মানুষ বন-জঙ্গল বা জলাশয়ের কাছাকাছি থাকত, তখন রাতের নিস্তব্ধতায় অনেক সময় অদ্ভুত শব্দ বা ভ্রম তৈরি হতো।
সেই ভয় থেকেই ‘নিশি’র জন্ম। অনেক তান্ত্রিক আবার দাবি করেন, নিশি কোনো বিদেহী আত্মা নয়, বরং এটি কোনো অশুভ শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মায়া। নিশির মূল লক্ষ্য হলো মানুষকে নির্জন স্থানে যেমন গভীর জঙ্গল, শ্মশান বা পুকুর নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলা বা চিরতরে নিখোঁজ করে দেওয়া।একটি অদ্ভুত নিয়ম নিশির সাথে জড়িয়ে আছে—সে কখনোই তিনবার ডাকে না। সে দুবার ডেকে চুপ হয়ে যায়। যদি কেউ দুবার ডাকার মধ্যেই উত্তর দেয়, তবেই সে তার কবলে পড়ে। এজন্যই বলা হয়, রাতে কেউ ডাকলে অন্তত তিনবার ডাকার অপেক্ষা করতে হয়।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ‘নিশির ডাক’ বলে কিছু নেই। বৈজ্ঞানিক মনে করে অতিরিক্ত মানসিক চাপ, একাকীত্ব বা ভয়ের কারণে অনেক সময় আমাদের মস্তিষ্ক পরিচিত মানুষের কণ্ঠস্বর শোনার ভুল সংকেত তৈরি করে। আবার অনেকে ঘুমের ঘোরে হাঁটেন এবং অদ্ভুত আচরণ করেন, যাকে আগেকার মানুষ ‘নিশির ডাক’ বলে ভুল করত।
নিশির ডাক’ কেবল গ্রামবাংলার কোনো আদিম লোককথা বা নিছক কুসংস্কার কি না—সেই বিতর্ক চিরন্তন। বিজ্ঞান একে হ্যালুসিনেশন বা মানসিক বিভ্রম বলে উড়িয়ে দিলেও, রাতের নিস্তব্ধতায় আজও যখন কেউ নিজের অতি পরিচিত মানুষের কণ্ঠে নিজের নাম শুনতে পায়, তখন যুক্তির চেয়ে ভয়ই বড় হয়ে দাঁড়ায়।
হয়তো এটি আমাদের অবচেতনের কোনো খেলা, আর না হয় সত্যিই অন্ধকারের ওপারে ওত পেতে আছে এমন কোনো অশুভ শক্তি যা আমাদের চেনা স্বর ধার করে মরণফাঁদ পেতে রেখেছে। তাই নিঝুম রাতে হুট করে কেউ ডাকলেই সাড়া দেবেন না; মনে রাখবেন, এক মুহূর্তের কৌতূহল বা অসতর্কতা আপনাকে নিয়ে যেতে পারে এমন এক গন্তব্যে, যেখান থেকে ফেরার কোনো পথ নেই। সাবধান! অন্ধকার কিন্তু সবসময় একা থাকে না।

