নিজস্ব প্রতিনিধি , নবগ্রাম – মুর্শিদাবাদ জেলার লালবাগ মহকুমার অন্তর্গত একটি কৃষি ও প্রাণী সম্পদ অধুষ্যিত ব্লক। ১০-টি গ্রাম পঞ্চায়েতে বিভক্ত নবগ্রাম ব্লকের কৃষিজীবীদের মূল জীবিকা সবজি ও ধান চাষ (দুই ফসলি), পাট, সর্ষে এবং পশুপালন। এই নবগ্রাম ব্লকের অধীন নারায়ণপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত মাঝিগ্রাম জেলার অন্যতম পশু পালন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। সবুজে ঘেরা মাঝিগ্রামের আরো একটি বৈশিষ্ট্য প্রায় প্রতিটি পরিবার স্ব-নির্ভর গোষ্ঠীর আওতাভুক্ত। ফলে মহিলাদের সচেতনতা এবং আয় -রোজগারী কাজে মহিলাদের অংশগ্রহণ খুবই প্রশংসনীয়। আজ আমরা পরিচয় করাবো রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন থেকে উপকৃত এমনই চার জন সফল স্ব-নির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যাদের।
রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন নবগ্রাম ব্লকে কাজ শুরু করে ২০২০ সাল থেকেই মূলত স্বনির্ভর গোষ্ঠীর প্রশিক্ষণ এবং হেল্পলাইন পরিষেবার মাধ্যমে। ধীরে ধীরে এই কাজের পাশাপাশি আলোকপাত করা হয় প্রাণী সম্পদ বিকাশের উপর, বিশেষ করে COVID পরবর্তী কালে। ২০২১ সালের শেষ দিকে একটি গ্রামীণ সচেতনতা শিবির থেকে গ্রামবাসীরা, বিশেষ করে মহিলা পশুপালকরা রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের হেল্পলাইন নম্বর ১৮০০ ৪১৯ ৮৮০০ সহ বিভিন্ন জীবিকা বিকাশ কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত হন। ২০২৩ সালের ২৪ জুন রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন সারগাছি কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের সাথে যৌথ উদ্যোগে মাঝিগ্রামে পশু চিকিৎসা ও টিকাকরণ শিবিরের আয়োজন করে। মোট ২৮ জন প্রাণিপালক এই শিবিরে অংশগ্রহণ করে এবং ২৫১ টি প্রাণীর টিকাকরণ সম্পন্ন হয়। এই শিবিরের আগে পশুপালকরা মূলতঃ সাবেকি পদ্ধতিতেই প্রাণী পালন করতেন, ফলে শ্রম ও পুঁজি বিনিয়োগের তুলনায় মুনাফার পরিমান পর্যাপ্ত ছিল না। এই শিবিরের পর নীলিমা, ছায়ারানি, জ্যোৎস্না বা সুমিত্রার মতো প্রাণী পালকরা আজ খুঁজে পেয়েছে সুস্থায়ী প্রাণী পালনের দিশা।
নীলিমা মন্ডল (৫৫) মাঝিগ্রাম মা লক্ষী স্ব-নির্ভর গোষ্ঠীর একজন সদস্যা। অষ্টম মান উত্তীর্ণ নীলিমার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৯-জন। চাষযোগ্য জমির পরিমান এক একর, মূল ফসল ধান, সর্ষে এবং বিভিন্ন সবজি। এর সাথে রয়েছে বর্তমানে দুটি গরু এবং দুটি ছাগল। রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের পশু পালনের উপর আয়োজিত অডিও কনফারেন্সের একজন নিয়মিত শিক্ষার্থী নীলিমা। ২০২৩ সালের ২৪ জুন তারিখের শিবির থেকে গরু ও ছাগলের বিনামূল্যে টিকাকরণের পাশাপাশি ওষুধও পান নীলিমা। প্রাণী পালনের খুঁটিনাটিবিষয়গুলি জেনে নিয়ে আজ বাড়িয়েছেন দুগ্ধ উদপাদন। শিবিরের আগে যেখানে গাভী প্রতি দুধের উৎপাদন হতো ৩-৪ কেজি, সেখানে বর্তমানে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫.৫০ কেজি। স্থানীয় দুগ্ধ সমবায় গড়ে ৪৫/- টাকা কেজি দরে দুধ বিক্রি করে মাসিক আয় করছেন প্রায় ৭৪২৫/- টাকা। খরচ দৈনিক গড়ে গাভী প্রতি ৫০/- টাকা। অর্থাৎ নীট মুনাফা প্রায় ৬০০০/- টাকা।
সুমিত্রা মন্ডল (২৫) প্রকৃত অর্থেই একজন প্রগতিশীল পশু পালক। শিক্ষাগত যোগ্যতা সপ্তম মান উত্তীর্ণ। পরিবারের সদস্য ৬-জন। কৃষি জমি প্রায় ৫-একর। মূল ফসল ধান,সর্ষে, আলু, পেয়াঁজ ও সবজি। সুমিত্রার পশু খামারে বর্তমানে রয়েছে ৪-টি গরু, ১৪-টি ভেড়া, ১৪-টি ছাগল এবং ৩০-টি মুরগি। রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের পরিষেবা পাওয়ার আগের বছর সুমিত্রার দুটি গরু মারা যায়। বর্তমানে প্রাণী মৃত্যুর হার শূন্য। সম্প্রতি মাঠে গরু চরানোর সময় অন্য একটি গরুর আক্রমণে সুমিত্রা গরু আঘাতপ্রাপ্ত হয়। রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের নিঃশুল্ক নম্বর ১৮০০ ৪১৯ ৮৮০০ -থেকে প্রাণী বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে ওষুধ ও অন্যান্য পরামর্শে এক সপ্তাহের মধ্যে গরুটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয় ওঠে। পশুপালন শিবির থেকে বিনামূল্যে টিকাকরণ ছাড়াও প্রাণীর খাবার, ভিটামিনের প্রয়োগ, টিকাকরণ সূচি, জৈব সুরক্ষার বিষয়গুলি জেনে নিয়ে বাড়িয়েছেন দুধের উৎপাদন। আগে যেখানে দুধের উৎপাদন ছিল দৈনিক ৪-৫ কেজি, বর্তমানে উৎপাদনের পরিমান গাভী পিছু ৫.৫০-৬.০০ কেজি। কৃষি ও পশুপালন মিলিয়ে সুমিত্রার পারিবারিক আয় দুই লক্ষাধিক।
মাঝিগ্রাম মা লক্ষী স্ব-নির্ভর গোষ্ঠীর অন্যতম সদস্যা জ্যোৎস্না মন্ডল (৩০)। মাধ্যমিক উত্তীর্ণ জ্যোৎস্না বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ১৮-বছরে। দুই পুত্র সহ পরিবারের সদস্য সংখ্যা চার জন। স্বামী একজন ডেকোরেটর ব্যবসায়ী। ফলে পারিবারিক কৃষি ও পশু পালনের কাজ জ্যোৎস্নাকেই করতে হয়। ৫-একর লিজে নেওয়া জমি মূলতঃ ধান ও সর্ষে চাষেই ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে প্রাণীর মধ্যে রয়েছে ২-টি গরু, ৪-টি ছাগল এবং ১০-টি হাঁস। পশুপালন শিবির থেকে বিনামূল্যে প্রাণীর টিকা ও ওষুধের পাশাপাশি জ্যোৎস্না অডিও কনফারেন্সের নিয়মিত অংশগ্রহণকারী। এই শিবিরের আগে প্রায় প্রতি বছর হাঁস ও ছাগলের মৃত্যু ছিল এক স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু বর্তমানে প্রাণীর মৃত্যুর হার শূন্য। পাশাপাশি দুধের উৎপাদন গাভী প্রতি ৩.৫০-৪.০০ কেজি থেকে বেড়ে হয়েছে গড়ে ৫.০০ কেজি দৈনিক। স্থানীয় দুগ্ধ সমবায় গড়ে ৪২/- টাকা থেকে ৪৫/- টাকা কেজি দরে দুধ বিক্রি করছেন।
ছায়ারানি মন্ডল (৪০) এর জীবনী যথেষ্ট করুন। খুবই ছোট বেলায় পিতৃ হারা হন ছায়া। ফলে লেখাপড়া বিশেষ করতে পারেন নি, এক কথায় নব স্বাক্ষর। স্বামী মিষ্টির দোকানের কারিগর। দুই পুত্রের একজন স্নাতক এবং একজন তামিলনাড়ু তে বাদাম কারখানার কর্মী। ছায়ার পরিবার মূলতঃ পশু পালনের উপরেই সম্পূর্ণভাবে নির্ভর শীল। খামারে রয়েছে উন্নত প্রজাতির ২-টি গরু, এছাড়া আছে ২-টি ছাগল ও হাঁস, মুরগি। রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের অডিও কনফারেন্স ও টিকাকরণ শিবির থেকে বিনামূল্যে টিকা ও ওষুধ পাওয়ার পাশাপাশি যে কোনো সমস্যায় হেল্পলাইন নম্বরে যোগাযোগ করে তথ্যের আদানপ্রদান করেন ছায়া। আগে পক্স রোগে আক্রান্ত হয় প্রায় প্রতি বছর হাঁস মুরগির মৃত্যু ঘটতো, কিন্তু শিবিরের পর মৃত্যুর হার শূন্য। পাশাপাশি বিজ্ঞানসম্মত ভাবে প্রাণী পালন করায় দুধের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ছাগলের ওজনেরও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। পূর্বে বিক্রয়যোগ্য ছাগলের গড় ওজন ছিল ৭-৮ কেজি, রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের পরামর্শ অনুসরণ করে বর্তমানে ছাগল প্রতি গড় ওজন ৯-১০ কেজি। স্থানীয় বাজারে ৫০০/-টাকা থেকে ৬০০/- টাকা কেজি দরে ছাগল বিক্রি করে রোজগার বাড়িয়েছেন ছায়ারানির পরিবার।
নবগ্রাম – মাঝিগ্রাম ক্লাস্টার এলাকার প্রাণিপালনের সুস্থায়ী জীবিকার পরিপ্রেক্ষিতে রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের এই উদ্যোগ খুবই উপযোগী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। গ্রামের পশুপালকদের কথায় “” প্রতি বছর প্রাণীর অসুস্থতা ও মৃত্যু আমাদের জীবন জীবিকার প্রতিবন্ধকতা হয় দাঁড়িয়েছিল। বর্তমানে ধারাবাহিক শিবির থেকে বিনামূল্যে ওষুধের থেকেও অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রাণী পালনের পর্যায়ের সঠিক পদ
ক্ষেপটি জানাই আমাদের মূল প্রাপ্তি – যা ভবিষ্যতে এই এলাকায় প্রাণীর মৃত্যুর হারকে কমাতে সক্ষম হবে”” ।

