কাজ পাগল” সিডিপিও নিজের চেষ্টায় শিশুদের জন্যে গড়ছেন বই খেলনার ব্যাঙ্ক
নিজস্ব সংবাদদাতা ধূপগুড়ি, ২৯ ডিসেম্বরঃ অন্যান্য ব্লক আধিকারিক তো বটেই এমনকি সেন্টারের কর্মী সহায়িকারাও তাকে কাজ পাগলা লোক হিসেবেই চেনেন। ভোর থেকে সারাদিন প্রায় একই পোষাকে একই ভাবে ছুটে চলেন সেন্টার থেকে সেন্টারে। দপ্তরের গাড়ি থাকুক বা না থাকুক সঙ্গী মোটর বাইকে নিয়েই সেন্টার থেকে বাবা মায়েদের হেসেল অবধি তার স্বচ্ছন্দ বিচরণ। হাজারো পদ্ধতিগত সমস্যা, পরিবেশ, কর্মীর অভাব, আন্দোলন, বাবা মায়েদের সদিচ্ছা সত্বেও একজন গড়পড়তা সরকারি আধিকারিক যে হাল না ছাড়া জেদ নিয়ে বদলের আশায় লড়তে পারেন তা লোকতাকে না দেখলে বোঝা অসম্ভব। তাই নিজের কাজ পাগল ইমেজকে বদলাতে রাজি নন তিনি। প্রথম কর্মস্থল হিসেবে ধূপগুড়ি ব্লক শিশুবিকাশ প্রকল্প আধিকারিক হিসেবে তার কর্মজীবনের শুরু। আট বছর যাবত সেই কাজে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন তিনি। তাতে সুনাম কতটা জুটেছে তা পরের কথা তবে দ্বায়িত্ব চেপেছে অনেকটাই। একসময় ধূপগুড়ি ব্লক সামলানোর পরীবর্তে তাকে এখন সামলাতে হয় তিন তিনটে ব্লকের দ্বায়িত্ব। ধূপগুড়ি ও বানারহাট ব্লক মিলে মোট ৮৪৮টি আইসিডিএস সেন্টার এবং শিশু আলয়ের পাশাপাশি তার দ্বায়িত্বেই চলছে নাগরাকজাটা ব্লকের আরো ৩৭৭টি মিলে মোট ১২২৫ টি সেন্টার। এই কাজের চাপে অভিযোগের বদলে তার চেষ্টায় শুরু হয়েছে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র এবং শিশু আলয়ের বাচ্চাদের জন্যে বই এবং খেলনা ব্যাঙ্ক গড়ার কাজ।
শিশুবিকাশ প্রকল্প আধিকারিক সন্দীপ দে নিজের আওতাধিন তিনটি ব্লকে একার চেষ্টাতেই চলছে শৈশবকালীন যত্ন ও শিক্ষা সপ্তাহ ২০২২-২৩ পালন। ২৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সাতদিন ধরে তিনটি ব্লকের সমস্ত সরকারি বেসরকারি অফিস এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর থেকে শিশুপাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি নানা ধরণের খেলনা সংগ্রহের কাজ চলছে। সপ্তাহ শেষে এগুলি তুলে দেওয়া হবে শিশুয়ালয় এবং অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলোয়। অনেকটা জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ উপলক্ষে যেভাবে সারা দেশে ‘পুষ্টির ঝুড়ি’ বসিয়ে শিশুদের জন্যে পুষ্টিকর এবং সুষম খাবার সংগ্রহ এবং বিলি হয় সেই কায়দায় অফিস কাচারিতে বসানও হয়েছে বই খেলনার ঝুড়ি। পাশাপাশি এই সময়কালে সেন্টারগুলিতে যে বাবা মায়েদের সন্তানেরা আশে তাদের সাথেও যোগাযোগ করে প্রাক প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব দেওয়া নিয়ে চলছে আলোচনাচক্রও। সেই আলোচনায় কর্মী সহায়িকাদের পাশাপাশি অংশ নিচ্ছেন খোদ আধিকারিকও। কেন্দ্র বা রাজ্য দূরের কথা শুধুমাত্র একজন আধিকারিকের নেওয়া এই কর্মসূচী সফল করতে নেমেছেন সেন্টারগুলির কর্মী সহায়িকারাও। পশ্চিমবঙ্গ আসিডিএস কর্মী সমিতির ধূপগুড়ি ব্লক সভাপতি তথা অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী অপর্ণা বোস বলেন, ওনাকে অমানুষিক এবং লাগাতার কাজ করতে দেখে আমরাও অবাক হই। দীর্ঘ কর্মজীবনে অনেক আধিকারিক দেখলেও এই লোকটা আর পাচজন অফিসারের মতো মোটেই নন। কর্মী সহায়িকাদের সাথে তার আচরণ যেমন বন্ধুর মতো তেমনি দীর্ঘমেয়াদি ভাবে শিশুদের জন্যে জন্যে কিছু করার ভাবনা তার মধ্যে সবসময় দেখেছি। আমরা সর্বোত ভাবে চাইছি এই উদ্যোগ সফল হোক।
যার ভাবনায় এই ভিন্যধর্মী কর্মসূচী পালন সেই আধিকারিক লোকটাকে টানা দুদিন চেষ্টা করেও দেখা পাওয়া যায়নি অফিসে। সকাল থেকে দিনভর তিনি ছুটে চলেছেন শিশুদের জন্যে খেলনা ও বইয়ের অফুরাণ ভান্ডার গড়ার লক্ষেই। শেষ পর্যন্ত টেলিফোনেই নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বললেন, সাধারণত লোকে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বলতে বোঝেন বাচ্চাদের খাওয়া দাওয়ার জায়গা। বাস্তবে প্রাক প্রাথমিক শিক্ষাকে জোড় দেওয়ার ভাবনা থেকেই ২০১৩ সালে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলোকে শিশুয়ালয়ে উন্নীতকরণ শুরু হয়েছিল। পুষ্টিকর এবং সুষম আহারের পাশাপাশি প্রারম্ভিক স্তরে খেলার মাধ্যমে শিক্ষাদানের চেষ্টাকে ছড়িয়ে দেওয়ার ভাবনা থেকেই এই কর্মসূচী। এখনও পর্যন্ত যেটুকু সাড়া পাচ্ছি তাতে আশাকরবো চাবাগান, বনবস্তী, বিশাল গ্রামীণ এলাকা নির্ভর তিনটি ব্লক এবং পুর এলাকার সেন্টারগুলোয় আমরা কিছু হলেও শিশুপাঠ্য আকর্ষণীয় বই এবং খেলনা তুলে দিতে পারবো।
জেলা বইমেলাতেও এবারে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের দেখা গেছে শিশুদের জন্যে বই সংগ্রহ করতে। আধিকারিক সন্দীপ বাবু আশা করেন খেলনার ব্যবসায়ী থেকে উৎসাহী মানুষেরাও একদিন অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলোর জন্যে নিজের উদ্যোগেই খেলনা দেবনে। পেশাগত কারণেই হয়তো একদিন এই মানুষটা বদলী হবেন অন্যত্র তবে তার আগে পরিস্থিতিটুকু যদি এক ইঞ্চিও বদলায় তার কৃতিত্বটুকু থাকবে সন্দীপ দে’র মতো মানুষের জন্যেই। কাজ পাগল ছাড়া এদুনিয়ায় কোন সদর্থক পরিবর্তনই আসেনি তার সাক্ষীও ইতিহাসই।

