নিশীথ দাস,TV-20 বাংলা :অপহরণের পর দুই মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর নৃশংস খুনের ঘটনায় ব্যাপক উত্তেজনা উত্তর ২৪ পরগণা বাগুইহাটিতে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাগুইহাটির ৮ নম্বর ওয়ার্ডে মোতায়েন করা হয়েছে বিশাল পুলিশ বাহিনী। ১৩ দিন অশনাক্ত অবস্থায় মর্গে পরেছিল দুই ছাত্রের মৃতদেহ। মঙ্গলবার খবর পেয়ে শনাক্ত করে পুলিশ। পুলিশি তদন্তে উঠে আসে অভিজিৎ বসুর নাম। অভিজিৎ বসুকে গ্রেফতারের পর জেরা করে উদঘাটন হয় এই হত্যা রহস্য।
কবে নিখোঁজ হয়েছিল অতনু ও অভিষেক
২২শে আগস্ট ২০২২ বাগুইহাটির জগৎপুর থেকে দুই ছাত্রের অপহরণের অভিযোগ আসে বাগুইহাটি পুলিশের কাছে। বাগুইহাটির হিন্দু বিদ্যাপীঠের দশম শ্রেণীর দুই ছাত্র অতনু দে এবং অভিষেক নস্কর দুদিন ধরে নিখোঁজ বলে বাগুইআটি থানায় অভিযোগ দায়ের করেছিল অতনু ও অভিষেকের পরিবার। তারপর থেকে বিভিন্ন থানায় বাগুইহাটি থানার তরফ থেকে পাঠানো হয়েছিল ছবিসহ তথ্য। খোঁজা হচ্ছিল আশেপাশের অঞ্চলে। বন্ধুবান্ধব ,আত্মীয় ,পরিজন সব জায়গায় খোঁজার পরেও নিখোঁজ দুই ছাত্রের সন্ধান না পাওয়ায় পুলিশ খোঁজা শুরু করেছিল নিখোঁজ দুই ছাত্রের নিখোঁজ হওয়ার মোটিভ।
অবশেষে খোঁজ পাওয়া গেল দুই ছাত্রের
অবশেষে দীর্ঘ ১৩ দিন বাদে পুলিশের কাছে খবর আসে বসিরহাটের মর্গে দুটি মৃতদেহ অশনাক্ত অবস্থায় পরে রয়েছে। মঙ্গলবার অতনুদের পরিবারের সদস্যরা গিয়ে অতনুর দেহ সনাক্ত করে। এরপরই প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। ২২শে আগস্ট থেকে নিখোঁজ থাকার পর এতদিন পুলিশ প্রশাসন কি করছিল?
পুলিশের বক্তব্য
বিধান নগর পুলিশ কমিশনারেটের ডিসি ডিডি বিশ্বজিৎ ঘোষ এদিন বিকেলে সাংবাদিক সম্মেলন করে জানান গোপন সূত্রে খবর পেয়ে অভিজিৎ বসু নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায় এই হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত সত্যেন্দ্র চৌধুরীর নাম। সত্যেন্দ্র চৌধুরী অতনু দের পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল। একটি বাইক কেনার জন্য অতনু সত্যেন্দ্রকে ৫০হাজার টাকা দিয়েছিল। তারপরেও সত্যেন্দ্র অতনুর কাছে আরো টাকার দাবি করে। সেই দাবি না মেটানোয় ২২শে আগস্ট সত্যেন্দ্র সহ আরো পাঁচজনকে নিয়ে একটি গাড়িতে অতনু এবং অভিষেককে ডেকে গাড়িতে তুলে নেয়। বাইক কিনেছি বলেই মূলত অতনুকে ডাকে সত্যেন্দ্র। সারাদিন গাড়িতে ঘোরার পর তারা একটি গাড়ির শোরুমেও ঢুকেছিল মাত্র১৫ মিনিটের জন্য। অবশেষে সন্ধ্যায় বাসন্তী হাইওয়েতে দড়ি দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে খুন করা হয় অতনু এবং অভিষেককে।
তারপরে দুই ছাত্রের মৃতদেহ দুটি পৃথক পৃথক জাগায় ফেলে দেয় অপরাধীরা। অভিজিৎ বসুর তথ্য অনুযায়ী পুলিশ আরো তিনজনকে গ্রেফতার করেছে।। (১) সামান আলী, (২) সাহিল মোল্লা, (৩)দিব্যেন্দু দাস। সত্যেন্দ্র চৌধুরী এবং আরো এক অপরাধী এখনো ফেরার ।তাদের খোঁজে চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন হলেও রয়ে গিয়েছে কিছু প্রশ্ন
(১) ৫০০০০ টাকা বাইক কেনার জন্য অতনু কেন সত্যেন্দ্রকে দিয়েছিল?
(২) বাইক দেখার কথা বলে অতনুকে ডেকেছিল সত্যেন্দ্র। শুধু বাইক দেখতেই অতনু তার বন্ধুকে কেন নিয়ে গিয়েছিল?
(৩) শুধু কি ৫০০০০ টাকার জন্যই ৬ জন মিলে দুই ছাত্রকে হত্যা করল? নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও কোন বড় রহস্য?
(৪) যেভাবে দুটি মৃতদেহকে ফেলা হয়েছে তা একমাত্র পরিপক্ক অপরাধীদের দ্বারাই সম্ভব। তাহলে কি অনেকদিন ধরেই এই হত্যার পরিকল্পনা করেছিল অপরাধীরা।
(৫) সত্যেন্দ্রর সঙ্গে যে সহযোগীরা ছিল তারাই বা কেন গিয়েছিল ঐ দুই ছাত্রের হত্যাকাণ্ডে? তাহলে কি আরো বড় অংকের টাকার খেলা ছিল?
(৫) নিরীহ অভিষেক যে এই ঘটনার সঙ্গে বিন্দুমাত্র সংযুক্ত ছিল না। তাহলে তাকে কেন খুন করল অপরাধীরা?
(৭) পুলিশ প্রশাসন দীর্ঘ ১৩ দিন ধরে তাহলে কি করছিল? তারা কি শুধুই দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছে?
(৮) বসিরহাটের মর্গে দুটি ছাত্রের মৃতদেহ অশনাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল দীর্ঘ ১৩ দিন। পুলিশ কি খোঁজার চেষ্টা করেনি, যে আশেপাশের কোন থানায় ছাত্র মিসিং রয়েছে কিনা?
(৯) এক কোটি টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছিল ২ ছাত্রের পরিবারের কাছ থেকে। সেক্ষেত্রে বারবার আসা মুক্তিপনের ফোন কি ট্রেস করেছিল পুলিশ? যদি ট্রেস করে থাকে তাহলেও অপরাধীদের কেন আগে ধরা সম্ভব হয়নি ?
(১০) বসিরহাটের পুলিশ সুপার জোবি থমাস জানিয়েছেন তারা দুই মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার পর বিভিন্ন থানায় জানিয়েছিল পরিচয় জানার জন্য । পুলিশ সুপারের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন,
১৩ দিন লেগে গেল কেন একই জেলায় দুই ছাত্রের পরিচয় সন্ধানে?
(১১) এক কোটি টাকার মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছিল। তাহলে কি মুক্তিপণ চাওয়া আসলে পুলিশের তদন্তের মোড় কে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল?
এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলেও এখনো বহু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। সত্যেন্দ্র চৌধুরী ধরা পরার পর হয়তো মিলতে পারে সম্পূর্ণ উত্তর। এখনো পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্ত চলছে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার।

