মাধব দেবনাথ, নদিয়া : শক্ত ও বৈষ্ণব ধর্মের মিলন ক্ষেত্র মানেই নদীয়ার শান্তিপুর ধাম। এই শান্তিপুরে কতই না ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে, যার এক অনন্যতম নাম জড়িয়ে রয়েছে রাসউৎসব অর্থাৎ রাসলীলা। জানা যায় শান্তিপুরের প্রথম রাস উৎসবের সূচনা হয়েছিল অদ্বৈত আচার্যের বংশধর বড় গোস্বামী বাড়ি থেকে। বড় গোস্বামী বাড়ির মূল প্রতিষ্ঠাতা মথুরেস গোস্বামী এই রাস উৎসবের সূচনা করেছিলেন, তারপরেই বড় গোস্বামী বাড়ির একাধিক বংশধরদের বাড়িতে শুরু হয় রাসলীলা অর্থাৎ রাস উৎসব। আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে বিগ্রহ ঠাকুর রাধারমন চুরি হয়ে যায়, এরপর দেবী কাত্যায়নীর ব্রত করে সেই রাধারমনকে ফিরে পায়। কথিত রয়েছে রাধা রমন একা থাকার কারণে রাধিকাকে প্রতিষ্ঠিত করে যুগল ঘটনা হয়েছিল, এরপর বিবাহের রীতি মেনে শুরু হয় রাসলীলা।
তবে বিয়ের অনুষ্ঠানের মতই মহবত সানাই বাজিয়ে ইষ্ট দেবতা রাধারমন জিউকে তোলা হয় রাসমঞ্চে, এরপর তিনদিন ধরে চলে রাসলীলা, যাকে এক কথায় বলা ভাঙ্গা রাস। জানা যায় শান্তিপুরের বড় গোস্বামী বাড়ি ও বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামী বাড়ি সহ আরো ২২ টি গোস্বামী বাড়িতে সাড়ম্বরে পালিত হয় রাসলীলা। প্রত্যেকটি গোস্বামী বাড়ি রস উৎসবের তিন দিন আলোক মালায় সজ্জিত হয়ে থাকে। বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো হাজারো ভক্তবৃন্দ ছুটে আসেন গোস্বামী বাড়ি সহ অন্যান্য গোস্বামী বাড়ি গুলির রাস উৎসব দেখতে। প্রত্যেকটি বিগ্রহ অষ্টধাতু দিয়ে তৈরি, এবং সোনার অলংকারে সুসজ্জিত করা হয়।
বড় গোস্বামী বাড়ির রাধারমন জিউ কয়েক শতাব্দীর। একটা সময় পুরীতে রাধারমনকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল, আর সেখানে রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতি থাকায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাংলাদেশের যশোরে, সেখানেই নবাবদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে বড় গোস্বামী বাড়ির বংশধর মথুরেশ গোস্বামী রাধারমনকে নিয়ে এসেছিল এই বড় গোস্বামী বাড়িতেই, কারণ সেই সময় মথুরেস গোস্বামী ছিলেন যশোরের বৈষ্ণবদের গুরুদেব, তাই ইষ্ট দেবতা কে রক্ষা করতে সেখানকার সেবাইতরা গুরুদেবের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তারপর থেকেই শান্তিপুরে শুরু করেছিলেন রাসলীলা।
তবে প্রায় ৪০০ বছরের প্রথা এখনো যেন অক্ষর অক্ষরে পালন করে প্রত্যেকটি গোস্বামী বাড়ির সদস্যরা। যে যেখানেই কর্মসূত্রে থাকুক না কেন রাস উৎসবের এই তিন দিন বাড়ির বিগ্রহ দেবতার আরাধনায় ব্রতী হন প্রত্যেকেই। ইতিমধ্যে বড় গোস্বামী বাড়ির রাস মঞ্চ সাজিয়ে তোলা হয়েছে আলোক সজ্জায়, আগত দর্শনার্থীরা যাতে রাধারমন জিউড় রাসলীলা যেন চাক্ষুষ দেখতে পারে তার জন্য করা হয়েছে বিশেষ সুব্যবস্থা। তবে এই ভাঙারাস উৎসবের তিন দিন বড় গোস্বামী বাড়ির নাট মন্দির থেকে রাজ মঞ্চ পর্যন্ত পুলিশের কড়া প্রহরার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

