Sunday, April 19, 2026
- Advertisement -

তেলের আগুনে পুড়ছে জনপ্রিয়তা, যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে কেন পালাচ্ছেন ট্রাম্প

- Advertisement -

তেলের আগুনে পুড়ছে জনপ্রিয়তা, যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে কেন পালাচ্ছেন ট্রাম্প?

অনন্যা ব্যানার্জী, কলকাতা: যে হুঙ্কার দিয়ে শুরু হয়েছিল এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত, মাত্র পাঁচ সপ্তাহেই তার সুর কাটল ওয়াশিংটনে। মধ্যপ্রাচ্যের মরুঝড়ে ইরানকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার যে শপথ ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়েছিলেন, আজ সেই রণক্ষেত্র থেকেই সসম্মানে ফেরার পথ খুঁজছেন তিনি। যে ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ বা চরম চাপের নীতিতে তেহরানকে নতজানু করতে চেয়েছিলেন, উল্টো সেই চাপের মুখে আজ হোয়াইট হাউস নিজেই দিশেহারা। একদিকে আকাশচুম্বী তেলের দাম আর অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলে ক্রমবর্ধমান একাকীত্ব—সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধের ময়দানে ট্রাম্প এখন এক ‘পরাজিত সেনাপতি’। প্রশ্ন উঠেছে, কেন যুদ্ধের দামামা বাজিয়েও এখন সন্ধির সাদা পতাকা ওড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট?

 

 

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংবাদ এবং বিশ্লেষকগণের মতে, ইরান-মার্কিন সংঘাতের আবহে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনেকেই এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ‘লুজ়ার’ বা পরাজিত পক্ষ হিসেবে অভিহিত করছেন। দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধের পর গত ৭ এপ্রিল ট্রাম্প একটি ১৫ দিনের দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন।

দ্য ইকোনমিস্ট এবং দ্য গার্ডিয়ানের মতো শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা (regime change) এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করা। কিন্তু পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধের পর ইরান আরও বেশি কট্টরপন্থী শাসনের অধীনে চলে গেছে এবং তাদের পারমাণবিক ও সামরিক শক্তি আগের চেয়েও বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

যুদ্ধে ইতোমধ্যে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং শত শত আহত হয়েছেন। কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ হলেও অর্জিত হয়েছে খুব সামান্যই। এছাড়া অভ্যন্তরীণভাবে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং কৃষিখাতে সারের সংকট দেখা দিয়েছে, যা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। ইউরোপীয় এবং ন্যাটো মিত্ররা ট্রাম্পের এই যুদ্ধে সমর্থন দেয়নি। মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা না করেই আক্রমণ শুরু করায় আমেরিকা বিশ্বরাজনীতিতে অনেকটা একঘরে হয়ে পড়েছে।

ইরান যুদ্ধের শুরুতেই অত্যন্ত কৌশলগত হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) বন্ধ করে দিয়েছিল, যা বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহে ধস নামায়। বর্তমানে ট্রাম্প ইরানের দেওয়া ১০-দফা শান্তি প্রস্তাবের ভিত্তিতে আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছেন, যেখানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং ইরানের ওপর থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার মতো শর্ত রয়েছে। বিশ্লেষকরা একে আমেরিকার “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” বলে বর্ণনা করছেন।

যুদ্ধের জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর চাপ থাকলেও খোদ ট্রাম্পের মন্ত্রিসভায় (বিশেষ করে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স) এই যুদ্ধের তীব্র বিরোধিতা ছিল। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দল এবং আসন্ন নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে ট্রাম্প এই “অসমাপ্ত” যুদ্ধ থেকে দ্রুত নিষ্কৃতি পাওয়ার পথ খুঁজছেন।

বর্তমানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, নিজের দেওয়া “বিপর্যয়কর আক্রমণের” হুমকি থেকে ট্রাম্পের এই দ্রুত ইউ-টার্ন বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার আধিপত্যকে খর্ব করেছে।

 

 

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ইরান অভিযান কেবল একটি সামরিক ব্যর্থতাই নয়, বরং এটি তাঁর দীর্ঘদিনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির জন্যও এক বড় আঘাত। যে যুদ্ধের জয় দিয়ে তিনি বিশ্বমঞ্চে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, সেই রণক্ষেত্র থেকেই আজ তাঁকে তড়িঘড়ি পিছু হটতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই জটিল দাবার চালে তেহরান যে ধৈর্য আর কৌশলের পরিচয় দিয়েছে, তার কাছে ওয়াশিংটনের হুঙ্কার শেষ পর্যন্ত পরাস্ত হয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইতিহাসের পাতায় এই যুদ্ধ হয়তো ট্রাম্পের এক হঠকারী সিদ্ধান্ত হিসেবেই লেখা থাকবে, যেখানে জেতার চেয়ে হারানোর পাল্লাই ছিল বেশি ভারী। এখন দেখার বিষয়, ইসলামাবাদের শান্তি আলোচনা আমেরিকার হারানো ভাবমূর্তি কতটা পুনরুদ্ধার করতে পারে, নাকি এটি কেবল এক দীর্ঘস্থায়ী পরাজয়ের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হয়েই রয়ে যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments